আসন্ন শীতে পাকিস্তানি মুজরার উষ্ণ হাওয়া—সরজিস আলমের সাংস্কৃতিক জাদুবিদ্যায় নতুন বিতর্ক
বাংলাদেশের শীত মানেই পিঠাপুলি, আগুনের পাশে গল্প, আর এখন নাকি… পাকিস্তানি মুজরা! হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন। দেশের বহুল আলোচিত সাংস্কৃতিক উদ্যোক্তা সরজিস আলম ঘোষণা দিয়েছেন, “এই শীত হবে অন্যান্য শীতের চেয়ে একটু বেশি ছন্দময়।” ছন্দময় কি মাটির ঢেঁকি ধ্বনিতে? না, তার পরিকল্পনায় বাজবে টবলাবীট, ফিতাবাঁধা নৃত্যের ঝনঝনানি, আর ঝলমলে লাইটে ঝলসে যাবে দেশীয় সংস্কৃতির রঙ।
ব্যঙ্গ ছাড়া কেউ এই ঘোষণাকে নিতে পারছে না। কারণ, অন্যদিকে দেখলে দেখা যায়—দেশের বাউল শিল্পীরা, যাদের গানে রয়েছে মাটির গন্ধ ও মুক্তির কথা, তারা আজ জেলখানার দেয়ালে ঠোকাঠুকি করছে মিথ্যা মামলার ফাঁদে। গতকালই মানিকগঞ্জে কয়েকজন বাউল শিল্পীর ওপর হামলা চালিয়েছে তথাকথিত “তাওহিদী জনতা” নামধারী এক জঙ্গিগোষ্ঠী। আর সেই সময়েই দেশে ঢুকছে পাকিস্তানি শিল্পীদের ব্যান্ডেল পর ব্যান্ডেল, যেন আমাদের মাটির গান ও মনের কথা মুছে দেয় এক বিদেশি উর্দুভাষী তালের আওয়াজে।
সরজিস আলম অবশ্য তার উদ্যোগকে বলছেন “সংস্কৃতির বিশ্বায়ন।” সাংবাদিকদের তিনি নাকি হেসে বলেছেন, “আমি শুধু চাই, বাংলাদেশের দর্শকও যেন আন্তর্জাতিক তালে দুলে ওঠে—পদ্মা নদীর ঘাটেই যদি মুজরার হাওয়া লাগে, ক্ষতি কোথায়?”
ক্ষতি কোথায়, সেটাই এখন প্রশ্ন। কারণ, এই জাতীয় আয়োজনকে সমালোচকরা বলছেন “বাংলাদেশি শিল্পচর্চার কফিনে পাকিস্তানি পেরেক।” সামাজিক মাধ্যমে ঝড়—#মুজরা_মুক্ত_সংস্কৃতি এবং #সরজিস_স্পনসরড_সত্তা হ্যাশট্যাগে। কেউ লিখেছে, “আমাদের বাউলরা জেলে, আর গান বাজছে দায়রা বান্দরের তালে।” কেউ আবার তির্যক ভাষায় বলছে, “সরজিস ভাই, সংস্কৃতির বাজারে ডিসকাউন্ট দিলে অন্তত জাতীয় সত্তাটা ফ্রি রাখুন!”
সংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। স্বাধীনতার চেতনাকে আঘাত করার জন্য এক আত্মঘাতী ‘শিল্প-নীতিহীনতা’ জন্ম নিচ্ছে—যেখানে স্বাধীন সুর গলা টিপে মারা হচ্ছে, আর তার জবাবে আমদানি করা হচ্ছে মেকআপচকচকে মিথ্যা ঐতিহ্য।
শীতকালের শুরুতেই দেশের সাংস্কৃতিক আকাশে শোনা যাচ্ছে এক অদ্ভুত জোড় গান:
এক পাশে বাউল বন্দী, অন্য পাশে মুজরা অন দ্য মাইক!
দেশবাসীর মুখে তাই একটাই তিক্ত প্রশ্ন—
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও, কেন আমাদের মঞ্চ এমনভাবে দখলে নিচ্ছে তারা,
যাদের সুরে একদিন আমাদের কান্না মিশে ছিল?
যে দেশে লালনের “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি” গানে পুলিশি রেইড হয়,
সেই দেশে মুজরার তালে হাততালি শুনে হয়তো শীত একটু বেশি ঠান্ডা,
আর বিবেক একটু বেশি নিস্তব্ধ।

